একজন ক্রিকেটারকে দল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত যে শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেটিই সামনে এনেছে। জাতীয় দলের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে আইপিএলের একটি সিদ্ধান্ত এখন আর কেবল ক্রিকেটীয় ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি কূটনীতি, বাণিজ্যিক স্বার্থ ও বৈশ্বিক ক্রিকেট অর্থনীতির আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আইপিএল নিলামে কলকাতা নাইট রাইডার্স মোস্তাফিজুর রহমানকে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে দলে ভেড়ালেও পরবর্তীতে তাকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক চাপ ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে মোস্তাফিজের চুক্তির পুরো অর্থই কার্যত লোকসান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত আর্থিক ক্ষতিতেই থেমে থাকেনি।
এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ক্রিকেট সম্পর্কের টানাপোড়েন প্রকাশ্যে আসে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আসন্ন টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কটের ঘোষণা দেয়, যে টুর্নামেন্টের আয়োজক ভারত ও শ্রীলঙ্কা। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন পাকিস্তানও বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি দেয়। পরে তারা স্পষ্ট করে জানায়, পুরো টুর্নামেন্ট নয়—শুধু ভারতের বিপক্ষে ম্যাচই তারা বয়কট করবে।
মোস্তাফিজুর রহমানের ব্যক্তিগত ক্ষতির অঙ্ক যেখানে ৯ কোটির কিছু বেশি, সেখানে এই সিদ্ধান্তগুলোর প্রভাব আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাণিজ্যিক কাঠামোয় বহুগুণ বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। আধুনিক ক্রিকেট কেবল মাঠের প্রতিযোগিতা নয়; এটি এখন সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ, ডিজিটাল কনটেন্ট ও বৈশ্বিক দর্শকসংখ্যা নির্ভর এক বিশাল শিল্প।
বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে কিছু ম্যাচকে ‘হাই ভ্যালু ইভেন্ট’ হিসেবে ধরা হয়। এর মধ্যে ভারত–পাকিস্তান ম্যাচকে বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বৈরথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাজার বিশ্লেষকদের রক্ষণশীল অনুমান অনুযায়ী, সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন, টিকিট বিক্রি, স্পনসরশিপ ও সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড মিলিয়ে একটি ভারত–পাকিস্তান ম্যাচের বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬ হাজার কোটিরও বেশি টাকা।
ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ চলাকালে মাত্র ১০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপন স্লট বিক্রি হয় ২৫ থেকে ৪০ লাখ ভারতীয় রুপিতে। ধারণা করা হয়, একটি ম্যাচ থেকেই বিজ্ঞাপন বাবদ প্রায় ৩০০ কোটি রুপি আয় হয়।
এই ধরনের ম্যাচ বাতিল বা বয়কট হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সম্প্রচার স্বত্ব কিনে নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা আগেই বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে আইসিসির কাছ থেকে বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব নেয়। সেই বিনিয়োগের বড় অংশই ওঠে উচ্চ দর্শকসংখ্যার ম্যাচ থেকে। ফলে নির্ধারিত ম্যাচ না হলে পুরো রাজস্ব কাঠামোতেই চাপ তৈরি হয়।
বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি জিওস্টার আগেই আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কার কথা তুলেছে বলে জানা গেছে। বড় ম্যাচ বাতিল হলে আইসিসির ওপর ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত দাবি কিংবা চুক্তিগত চাপ বাড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের একটি গড় বাণিজ্যিক মূল্য থাকলেও সব ম্যাচের গুরুত্ব সমান নয়। কিছু ম্যাচের আর্থিক ও কৌশলগত মূল্য অন্যগুলোর তুলনায় বহুগুণ বেশি। ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এই ম্যাচ না হলে শুধু তাৎক্ষণিক আয় নয়, স্পনসরদের ব্র্যান্ড এক্সপোজার, দর্শক টার্গেট পূরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির শর্তও ব্যাহত হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে আইসিসি, সংশ্লিষ্ট ক্রিকেট বোর্ড ও সম্প্রচার অংশীদারদের মধ্যে একটি জটিল আর্থিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ না নিলে তাদেরও আর্থিক ক্ষতি কম নয়। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ ফি, সম্প্রচার আয়ের অংশ, স্পনসর উপস্থিতি ও বৈশ্বিক প্রচারণা—সব মিলিয়ে একটি বড় টুর্নামেন্ট মিস করা মানে কয়েক কোটি ডলারের সম্ভাব্য আয় হারানো।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আবারও দেখিয়ে দিচ্ছে, আধুনিক ক্রিকেট আর শুধু ব্যাট–বলের খেলা নয়; এটি কূটনৈতিক সম্পর্ক, করপোরেট বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক দর্শকবাজারের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। একজন খেলোয়াড়কে কেন্দ্র করে নেওয়া সিদ্ধান্তও তাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।



















